আমরা প্রতিদিন নানা বৈঠকে বসি — পরিবারের আড্ডা, বন্ধুদের আলাপ, অফিসের মিটিং, দ্বীনি মজলিস। কথার ফাঁকে অনেক সময় এমন কিছু বলে ফেলা হয়, যা বলা উচিত ছিল না। হয়তো কারো সম্পর্কে এমন কথা বেরিয়ে যায়, হয়তো অপ্রয়োজনীয় কথায় সময় নষ্ট হয়, হয়তো হাসি-ঠাট্টার ছলে কারো মনে কষ্ট দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মনে হয়, ইশ! কথাগুলো না বললেই ভালো হতো। ইসলাম এই অনুভূতির জন্য একটি সহজ ও সুন্দর সমাধান দিয়েছে — মজলিসের কাফফারার দোয়া। বৈঠক থেকে ওঠার আগে এই ছোট দোয়াটি পড়ে নিলে বৈঠকের ভুলত্রুটির কাফফারা হয়ে যায়, ইনশাআল্লাহ।
মজলিসের কাফফারার দোয়াটি কী
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৈঠক শেষে ওঠার সময় এই দোয়াটি পড়তেন। আবূ বারযা আসলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো মজলিসে বসতেন, এরপর বসা শেষে উঠে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন তিনি এই দোয়া পাঠ করতেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এমন কথা বললেন যা আগে কখনো বলেননি। তিনি বললেন, “এটি মজলিসের ভুলত্রুটির কাফফারা স্বরূপ।” (সুনান আদ-দারেমী, হাদিস: ২৬৯৬)
দোয়াটি হলো: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ
উচ্চারণ: “সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তাগফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকা।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং আপনার প্রশংসা সহকারে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি এবং আপনার দিকে তওবা করছি।”
এই দোয়ার ফজিলত
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মজলিসে বসে এবং সেখানে তার কথাবার্তা বেশি হয়ে যায়, তারপর সে ওই মজলিস থেকে ওঠার আগে এই দোয়া পড়ে, তবে ওই মজলিসে যা কিছু ঘটেছে তা তার জন্য ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (সুনান আত-তিরমিজি)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, কিছু বাক্য আছে যা কোনো ব্যক্তি মজলিস থেকে ওঠার সময় তিনবার উচ্চারণ করলে তা তার ওই মজলিসের কাফফারা হয়ে যায়। আর যদি কেউ তা কোনো উত্তম মজলিসে বা জিকিরের মজলিসে পড়ে, তবে তা তার জন্য মোহর বা সিল স্বরূপ হয়। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৫৭)
ভাবুন তো, কত সহজ! মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি দোয়া, আর তার বিনিময়ে বৈঠকের অনিচ্ছাকৃত ভুল, বাড়তি কথা, গীবতের মতো গুনাহ থেকে মুক্তির সুযোগ। আর ভালো বৈঠক হলে এই দোয়া সেই ভালো কাজের ওপর সিলমোহর হয়ে যায় — যেন একটি সুন্দর চিঠির ওপর সিল মেরে দেওয়া হলো, যাতে তা নষ্ট না হয়।
কখন ও কীভাবে পড়বেন
এই দোয়ার মূল সময় হলো বৈঠক শেষে, ওঠার ঠিক আগে। অফিসের মিটিং শেষ হোক, পরিবারের আড্ডা হোক, বন্ধুদের গল্প হোক, কিংবা দ্বীনি আলোচনার মজলিস হোক — উঠে দাঁড়ানোর আগে একবার দোয়াটি পড়ে নিন। কেউ কেউ তিনবার পড়ার কথাও বলেছেন, যা আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে। একবার পড়লেও সুন্নত আদায় হয়, তবে তিনবার পড়া উত্তম।
অনেক আলেমের মতে, এই দোয়াটি আরও কয়েকটি জায়গায় পড়া যায় — যেমন কুরআন তিলাওয়াত শেষে, ওজুর শেষে এবং নামাজের পরের জিকির হিসেবে। তবে এর আসল ও প্রসিদ্ধ স্থান হলো মজলিস শেষে। তাই অভ্যাসটা সেখান থেকেই শুরু করুন: বৈঠক শেষ মানেই এই দোয়া।
বৈঠকের আদব: দোয়ার আগে যা মনে রাখবেন
দোয়াটি কাফফারা হলেও এর অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছা করে গীবত বা মিথ্যা বলে পরে দোয়া পড়ে নিলেই সব মাফ। কাফফারা কাজ করে অনিচ্ছাকৃত ভুল ও বাড়তি কথার ক্ষেত্রে। তাই বৈঠকে বসার সময়ও কিছু আদব মনে রাখা জরুরি। প্রথমত, কথা বলার আগে ভাবুন — এই কথাটি কি বলা দরকার? দ্বিতীয়ত, কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ আলোচনা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটাই গীবত। তৃতীয়ত, মিথ্যা, অশ্লীল কথা ও কাউকে অপমান করা থেকে জিহ্বাকে হেফাজত করুন। চতুর্থত, বৈঠকে আল্লাহর জিকির রাখার চেষ্টা করুন; যে বৈঠকে আল্লাহকে স্মরণ করা হয় না, সেই বৈঠক বরকতহীন হয়ে যায়।
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো, অন্যকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা। সবাই একসাথে কথা বললে বৈঠক বিশৃঙ্খল হয়, আর ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে। ধৈর্য ধরে শোনা, নম্রভাবে কথা বলা এবং প্রয়োজনে চুপ থাকা — এগুলোও মজলিসের সৌন্দর্য।
ছোট অভ্যাস, বড় বরকত
আমাদের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কাটে মানুষের সাথে কথাবার্তায়। প্রতিটি বৈঠকই হয় আমাদের আমলনামায় নেকি যোগ করবে, নয়তো গুনাহ। মজলিসের কাফফারার দোয়া এই দুইয়ের মাঝে একটি নিরাপত্তা-দেয়ালের মতো কাজ করে। বৈঠক শেষে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে এই দোয়াটি পড়া একটি ছোট অভ্যাস, কিন্তু এর বরকত অনেক বড়।
আজ থেকেই এই অভ্যাসটি শুরু করুন। পরিবারের সদস্যদেরও শেখান, বিশেষ করে শিশুদের। যখন তারা দেখবে বাবা-মা প্রতিটি বৈঠক শেষে এই দোয়াটি পড়ছেন, তখন তারাও শিখে যাবে। আর একটি পরিবার যখন এই সুন্নতকে জীবিত রাখে, তখন তাদের বৈঠকগুলোও হয়ে ওঠে বরকতময়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সব বৈঠককে গুনাহমুক্ত ও বরকতময় করুন, আমিন।



