ঘুমানোর আগের সুন্নত আমল ও দোয়াসমূহ

ভূমিকা

দিনের এক-তৃতীয়াংশের মতো সময় আমরা ঘুমিয়ে কাটাই। ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রাম নয়, এটি আল্লাহর দেওয়া এক বড় নিয়ামত। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তিনি ঘুমকে করেছেন বিশ্রামের মাধ্যম। তাই ঘুমের সময়টুকুও যদি সুন্নতের আলোকে সাজানো যায়, তবে বিশ্রামটাই ইবাদতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমানোর আগে কিছু নির্দিষ্ট আমল করতেন এবং উম্মতকে সেগুলো শিখিয়ে গেছেন। এই আমলগুলো কঠিন নয়, কিন্তু নিয়মিত করলে রাতটা নিরাপদ হয়, মনটা শান্ত হয় এবং সকালটা শুরু হয় প্রশান্তি নিয়ে।

অনেকেই রাতে ঘুমাতে যান মোবাইল হাতে নিয়ে, নানা চিন্তা মাথায় নিয়ে। অথচ ঘুমানোর আগের কয়েক মিনিটের সুন্নত আমল মনকে শান্ত করে, আল্লাহর স্মরণে ডুবিয়ে দেয়। আজকের লেখায় সেই আমলগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।

১. ওজু করে বিছানায় যাওয়া ও বিছানা ঝেড়ে নেওয়া

ঘুমানোর আগে ওজু করে নেওয়া সুন্নত। বারা ইবনে আজিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তুমি বিছানায় যেতে চাও, তখন নামাজের ওজুর মতো ওজু করে নাও (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। ওজু শরীরকে পবিত্র করে, মনকে সতেজ করে এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।

বিছানায় শোয়ার আগে বিছানা ঝেড়ে নেওয়াও সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাপড়ের ভেতরের কিনারা দিয়ে বিছানা ঝাড়তে বলেছেন, কারণ মানুষ জানে না তার অনুপস্থিতিতে বিছানায় কী এসেছে (সহিহ বুখারি ৬৩২০, সহিহ মুসলিম ২৭১৪)। ছোট এই আমলটি সতর্কতা ও পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেয়।

২. ঘুমের দোয়া: আল্লাহর নামে ঘুম ও জাগরণ

ঘুমানোর সবচেয়ে পরিচিত দোয়াটি হলো: “আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমূতু ওয়া আহইয়া” — অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মৃত্যুবরণ করি (ঘুমাই) এবং আপনার নামেই জীবিত হই (জাগি) (সহিহ বুখারি)। হুজাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে ডান হাত গালের নিচে রেখে এই দোয়া পড়তেন।

এই দোয়ার গভীর অর্থ আছে। ঘুমকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করা হয়েছে, কারণ ঘুমের সময় মানুষ দুনিয়ার সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, তিনি মৃত্যুর সময় প্রাণ হরণ করেন, আর যারা মরেনি তাদের প্রাণও ঘুমের সময় নিয়ে নেন (সূরা জুমার ৩৯:৪২)। তাই ঘুমাতে যাওয়ার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া মানে নিজেকে তাঁর হাতে সঁপে দেওয়া। আর ঘুম থেকে উঠে পড়তে হয়: “আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বাদা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশূর” — সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মৃত্যুর পর আমাদের জীবিত করলেন, আর তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

৩. আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পড়া

ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। আয়াতুল কুরসি হলো সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়ে, আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক তার জন্য নিযুক্ত থাকে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারে না (সহিহ বুখারি ২৩১১)।

এরপর সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস — এই তিনটি সূরা পড়া সুন্নত। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার সময় দুই হাত একত্র করে তাতে হালকা ফুঁ দিতেন এবং এই তিনটি সূরা পড়তেন। এরপর যতদূর সম্ভব দুই হাত দিয়ে শরীর মুছে নিতেন, মাথা ও মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে শরীরের সামনের অংশ পর্যন্ত। এভাবে তিনি তিনবার করতেন (সহিহ বুখারি ৫০১৭)। এই আমলটি শিশুদেরও শেখানো যায়, তারা আনন্দের সাথে শিখে নেয়।

৪. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত ও সূরা মুলক

রাতের আমলের মধ্যে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের বিশেষ মর্যাদা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে, তার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যায় (সহিহ বুখারি ৫০০৮, সহিহ মুসলিম ৮০৭)। অর্থাৎ এই দুই আয়াত রাতের নিরাপত্তা ও সওয়াবের জন্য যথেষ্ট। আয়াত দুটি শুরু হয় “আমানার রাসূলু” দিয়ে (সূরা বাকারা ২:২৮৫-২৮৬)।

সূরা মুলকও রাতে পড়ার ফজিলতপূর্ণ সূরা। হাদিসে এসেছে, কুরআনে ত্রিশ আয়াতের একটি সূরা আছে যা পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে এবং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, সেটি হলো সূরা মুলক (সুনানে তিরমিজি ২৮৯১)। প্রতিদিন পুরো সূরা পড়া সম্ভব না হলে ধীরে ধীরে মুখস্থ করার নিয়ত করা যায়, কয়েক আয়াত করে এগিয়ে যাওয়া যায়।

৫. ডান কাতে শোয়া ও ফাতিমি তাসবিহ

ঘুমানোর সুন্নত পদ্ধতি হলো ডান কাতে শোয়া এবং ডান হাত গালের নিচে রাখা (সহিহ বুখারি ২৪৭, ৬৩১৪)। অসুস্থতা বা বিশেষ কারণে অন্য পাশে শুলে তাতে গুনাহ নেই।

ঘুমানোর আগে ফাতিমি তাসবিহ পড়াও সুন্নত: ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার। ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা কাজের ক্লান্তি দূর করার উপায় চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই তাসবিহ শিখিয়েছিলেন। রাতে বিছানায় শুয়ে এই তাসবিহ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়া এক শান্ত অভ্যাস। সেই সাথে নিজের ভুলের জন্য ইস্তিগফার করা, কারো প্রতি ক্ষোভ থাকলে ক্ষমা করে দেওয়া এবং আগামী দিনের জন্য ভালো নিয়ত করা — এগুলো মনকে হালকা করে।

৬. ঘুমের পরিবেশ ও প্রতিদিনের ছোট রুটিন

সুন্নত আমলের পাশাপাশি ঘুমের পরিবেশটাও গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমানোর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে মোবাইল ও অপ্রয়োজনীয় আলো থেকে দূরে থাকা, ঘরটা অন্ধকার ও ঠান্ডা রাখা, আর নিয়মিত একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া — এগুলো ভালো ঘুমের জন্য সহায়ক। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ঘুমের আগে তাদের সাথে একটি দোয়া পড়ে নেওয়া, একটি ভালো গল্প শোনানো, তাদের দিনের ভালো কাজের প্রশংসা করা — এতে তাদের মনেও সুন্নতের অভ্যাস গড়ে ওঠে।

সহজ একটি রুটিন হতে পারে এমন: ওজু, বিছানা ঝাড়া, আয়াতুল কুরসি, তিন কুল পড়ে শরীরে হাত বুলানো, বাকারার শেষ দুই আয়াত, ঘুমের দোয়া, ডান কাতে শোয়া ও তাসবিহ। প্রথম দিকে সবগুলো কঠিন মনে হলে একটি-দুটি দিয়ে শুরু করুন, ধীরে ধীরে বাড়ান। নিয়মিত ছোট আমলই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।

উপসংহার

ঘুম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই ঘুম যদি সুন্নতের আলোকে সাজানো হয়, তবে রাতটা শুধু বিশ্রাম নয়, ইবাদতও হয়ে যায়। আয়াতুল কুরসির রক্ষা, তিন কুলের নিরাপত্তা, ঘুমের দোয়ার আত্মসমর্পণ — সব মিলিয়ে একজন মুমিন রাতে আল্লাহর হেফাজতে ঘুমায় এবং সকালে নতুন জীবন নিয়ে জাগে। আজ রাত থেকেই শুরু হোক: ওজু করে, বিছানা ঝেড়ে, দোয়া পড়ে ডান কাতে শোয়া। আল্লাহ আমাদের রাতগুলোকে নিরাপদ ও বরকতময় করুন, আমিন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top