ঘুম থেকে ওঠার দোয়া ও সকালের সুন্নত

রাতের গভীর ঘুম শেষে সকালে আবার চোখ মেলে তাকানো— এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি এক অনন্য অনুগ্রহ। ঘুমের সময় মানুষ নিজের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না; প্রাণপাখি যে আবার শরীরে ফিরে আসবে, এর কোনো নিশ্চয়তা কারো ছিল না। তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়ে গেছেন— ঘুম থেকে জাগার পর প্রথম কাজ হবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। তাঁর শেখানো ছোট্ট একটি দোয়া আর কয়েকটি সুন্নত আমল দিয়েই শুরু হতে পারে আমাদের প্রতিটি সকাল, বরকত আর প্রশান্তিতে ভরা এক নতুন দিনের সূচনা।

ঘুম থেকে ওঠার দোয়া

ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) যে দোয়াটি পাঠ করতেন, তা হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে—

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُوْرُ

বাংলা উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি আহ্ইয়ানা বা’দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশূর।

অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের মৃত্যুর মতো ঘুমের পর পুনরায় জীবিত করেছেন; আর তাঁরই দিকে হবে পুনরুত্থান। (সহীহ বুখারী: ৬৩২৪)

সহীহ বুখারীর এই হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, দোয়াটি পড়া রাসূল (সা.)-এর নিয়মিত আমল ছিল। চোখ খুলেই, বিছানা ছাড়ার আগেই, অন্য কোনো কথা বলার পূর্বে এই দোয়া পড়াই সর্বোত্তম।

দোয়ার গভীর তাৎপর্য

এই ছোট্ট দোয়াটির প্রতিটি শব্দে রয়েছে গভীর শিক্ষা। “আলহামদু” বলে আমরা স্বীকার করছি— জীবন আমাদের নিজের অর্জন নয়, এটি আল্লাহর দান। ঘুমকে এখানে “মৃত্যুর” সাথে তুলনা করা হয়েছে, কারণ ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের আত্মা যেন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে; আবার জাগরণ হলো নতুন করে জীবন লাভ। আর “ইলাইহিন নুশূর” আমাদের মনে করিয়ে দেয়— যেভাবে প্রতিদিন ঘুম থেকে জাগি, একদিন ঠিক সেভাবেই কবর থেকে উঠে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। প্রতিদিন সকালে এই দোয়া পড়া মানে প্রতিদিন মৃত্যু ও পরকালের কথা স্মরণ করা, যা গুনাহ থেকে বাঁচতে ও সৎপথে চলতে শক্তি জোগায়।

ঘুম থেকে উঠে রাসূল (সা.)-এর সুন্নত

শুধু দোয়া পড়েই থেমে থাকেননি প্রিয় নবী (সা.); ঘুম থেকে উঠে তিনি আরও কিছু সুন্দর আমল করতেন—

  • হাত দিয়ে মুখ মোছা: ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, এক রাতে তিনি রাসূল (সা.)-এর ঘরে ছিলেন। নবীজী (সা.) ঘুম থেকে জেগে উঠে হাত দিয়ে মুখ মুছে নিলেন, তারপর সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। (সহীহ বুখারী: ১৮৩)
  • মেসওয়াক করা: হুযাইফা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রাতে ঘুম থেকে জাগলে মেসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন। (সহীহ মুসলিম: ২৫৫) মুখের পবিত্রতা ইবাদতের প্রস্তুতির অংশ।
  • ওজু করে নেওয়া: ঘুম থেকে উঠে ওজু করা ফজরের নামাজের প্রস্তুতি। ওজুর মাধ্যমে শরীর সতেজ হয়, মন প্রশান্ত হয় এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তি মেলে।
  • ডান দিক থেকে শুরু: পোশাক পরা, জুতা পরাসহ ভালো কাজে ডান দিক থেকে শুরু করা রাসূল (সা.)-এর প্রিয় সুন্নত। (সহীহ বুখারী: ১৬৮)

রাতে ঘুম ভাঙলে বিশেষ দোয়া

অনেক সময় রাতে ঘুম ভেঙে যায়। সেই মুহূর্তটিও ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ। উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জেগে এই দোয়া পড়ে— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল ওয়াহিদুল ক্বাহহারু রব্বুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়া মা বাইনাহুমাল আযিযুল গাফফার —অর্থাৎ ‘একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; তিনি এক, পরাক্রমশালী, আসমান-জমিন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর রব; তিনি মহাপরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল’— তারপর যদি সে ক্ষমা চায়, তাকে ক্ষমা করা হবে; আর যদি দোয়া করে, তা কবুল করা হবে।” (সহীহ বুখারী: ১১৫৪)

এছাড়া রাসূল (সা.) রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে যে দীর্ঘ দোয়া পড়তেন— “আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু আনতা নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি…” (হে আল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা তোমারই; তুমি আসমান ও জমিনের নূর…) (সহীহ বুখারী: ১১২০)— তা পড়ারও বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

সকালের মাসনূন আমল

ঘুম থেকে উঠে দোয়া পড়ার পর সকালের কিছু মাসনূন জিকির রয়েছে, যা দিনভর সুরক্ষা ও বরকত বয়ে আনে—

  • সকালের দোয়া: রাসূল (সা.) সকালে বলতেন— আসবাহনা ওয়া আসবাহাল মুলকু লিল্লাহ (আমরা সকাল করলাম এবং রাজত্ব আল্লাহরই)। (সহীহ মুসলিম: ২৭২৩)
  • তিনবার পড়ার দোয়া: বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়াদুর্রু মা’আসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা-ই ওয়া হুয়াস সামীউল আলীম — সকালে তিনবার পড়লে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সুনান তিরমিজি: ৩৩৮৮)
  • সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার: সকালে একবার পড়ে যদি দিনে মারা যায়, সে জান্নাতি হবে। (সহীহ বুখারী: ৬৩০৬)
  • ফজরের নামাজ: সকালের সবচেয়ে বড় আমল হলো ফজরের নামাজ জামাতের সাথে (বা সময়মতো) আদায় করা।

উপসংহার

দিনের শুরু নির্ধারণ করে দেয় পুরো দিনের ধারা। যে সকাল শুরু হয় আল্লাহর শুকরিয়া, রাসূল (সা.)-এর সুন্নত দোয়া আর মাসনূন জিকির দিয়ে, সে দিন হয় বরকতময় ও প্রশান্ত। আসুন, আজ থেকেই অভ্যাস করি— চোখ খুলেই “আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি আহ্ইয়ানা…” পড়া, মেসওয়াক ও ওজু করা, আর সকালের মাসনূন আমলে নিজেকে সাজিয়ে নেওয়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসূল (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী প্রতিটি সকাল শুরু করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top