প্রতিদিন ভোরে আমরা ঘুম থেকে উঠে নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি—অফিস, ব্যবসা, পড়াশোনা কিংবা সংসারের কাজ। আর সন্ধ্যায় দিনের ক্লান্তি নিয়ে ফিরে আসি ঘরে। কিন্তু এই দুইটি সময়—সকাল ও সন্ধ্যা—আল্লাহ তাআলার কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন কিছু মাসনূন দোয়া ও জিকির, যা সকাল-সন্ধ্যায় পড়লে সারাদিন আল্লাহর সুরক্ষায় থাকা যায়। মাত্র দশ মিনিটের এই আমল আপনার দিনটাকেই বদলে দিতে পারে।
সকাল-সন্ধ্যার দোয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দিনের শুরুটা যদি আল্লাহর নামে হয়, আর দিনের শেষেও তাঁরই জিকিরে হয়—তাহলে পুরো দিনটাই তাঁর রহমতের ছায়ায় কাটে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকালে-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো” (সূরা আল-আহযাব: ৪১-৪২)। সকাল-সন্ধ্যার জিকির শুধু সওয়াবের কাজই নয়; এটি মনের অশান্তি দূর করে, বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক গভীর করে।
সকাল-সন্ধ্যায় পড়ার প্রধান মাসনূন দোয়াসমূহ
১. আয়াতুল কুরসি (একবার)
আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল-হাইয়্যুল-ক্বইয়্যূম… (সূরা আল-বাকারা: ২৫৫)। কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত হিসেবে পরিচিত। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি সকালে এটি পাঠ করবে, সন্ধ্যা পর্যন্ত এবং যে সন্ধ্যায় পাঠ করবে, সকাল পর্যন্ত শয়তান ও অনিষ্ট থেকে হেফাজতে থাকবে।
২. তিন কুল: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস (প্রতিটি ৩ বার)
আবদুল্লাহ ইবনে খুবাইব (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, সকাল-সন্ধ্যায় তিন কুল তিনবার করে পাঠ করো—এই আমল তোমাকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবে (সুনান আবু দাউদ: ৫০৮২; জামে তিরমিজি: ৩৫৭৫)।
৩. সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার (একবার)
আল্লাহুম্মা আন্তা রব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া’দিকা মাসতাতা’তু, আ’উযু বিকা মিন শাররি মা সানা’তু, আবূউ লাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবূউ বিজানবি ফাগফির লি, ফা-ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ-জুনূবা ইল্লা আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আপনার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিতে আছি। আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আমার প্রতি আপনার নিয়ামত স্বীকার করি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করি। আমাকে ক্ষমা করুন; কারণ আপনি ছাড়া গুনাহ কেউ ক্ষমা করে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসে সকালে এটি পড়ে এবং সন্ধ্যার আগে মারা যায়, সে জান্নাতবাসী হবে; আর যে সন্ধ্যায় পড়ে এবং সকালের আগে মারা যায়, সেও জান্নাতবাসী হবে (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬)।
৪. বিসমিল্লাহিল্লাজি… (৩ বার)
বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা’আসমিহি শাইউন ফিল-আরদি ওয়ালা ফিস-সামা, ওয়া হুয়াস-সামিউল-আলীম।
অর্থ: আল্লাহর নামে, যাঁর নামের সাথে পৃথিবীতে ও আকাশে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় এটি তিনবার পড়বে, কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না (জামে তিরমিজি: ৩৩৮৮)।
৫. সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি (১০০ বার)
অর্থ: আল্লাহ সকল অপূর্ণতা থেকে পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় একশবার এটি পড়বে, কিয়ামতের দিন তার চেয়ে উত্তম আমল নিয়ে কেউ আসতে পারবে না, কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া যে তার মতো বা তার চেয়ে বেশি পড়েছে (সহিহ মুসলিম: ২৬৯২)।
৬. হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া… (৭ বার)
হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া, আলাইহি তাওয়াক্কালতু, ওয়া হুয়া রব্বুল-আরশিল-আজিম।
অর্থ: আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁর ওপরই ভরসা করেছি, তিনি মহান আরশের অধিপতি।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় সাতবার এটি পড়বে, দুনিয়া ও আখিরাতের সব দুশ্চিন্তার জন্য আল্লাহ তাআলা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন (সুনান আবু দাউদ: ৫০৮১)।
৭. আ’উযু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক (৩ বার)
অর্থ: আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।
বিশেষত সন্ধ্যায় এই দোয়া পড়লে রাতের সব অনিষ্ট—হিংস্র প্রাণী, জিন-শয়তান, ক্ষতিকর পোকামাকড়—থেকে আল্লাহ রক্ষা করেন (সহিহ মুসলিম: ২৭০৯)।
কখন পড়বেন এবং কীভাবে অভ্যাস করবেন?
সকালের দোয়াগুলোর সময় হলো ফজরের নামাজের পর থেকে সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত; তবে সূর্যোদয়ের পরেও দুপুরের আগে পড়া যায়। সন্ধ্যার দোয়ার সময় হলো আসরের পর থেকে মাগরিবের আগে। শুরুতে সবগুলো একসাথে পড়া কঠিন মনে হলে ধীরে ধীরে শুরু করুন—প্রথমে আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল দিয়ে শুরু করুন, তারপর প্রতিদিন একটি করে নতুন দোয়া যোগ করুন। মনে রাখবেন, অর্থ বুঝে পড়াই আসল উদ্দেশ্য; যান্ত্রিকভাবে পড়ার চেয়ে মনোযোগ দিয়ে কম পড়া উত্তম।
উপসংহার
সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন দোয়া হলো মুমিনের দৈনন্দিন ঢাল। ব্যস্ত জীবনে মাত্র দশ মিনিট সময় বের করে এই আমলগুলো করলে আল্লাহর সুরক্ষা, মনের প্রশান্তি এবং পরকালের সওয়াব—সবই একসাথে অর্জন করা যায়। আজ থেকেই শুরু করুন; একবার অভ্যাসে পরিণত হলে দেখবেন, এই ছোট আমলই আপনার জীবনের বড় আশীর্বাদ।