বিসমিল্লাহ: প্রতিটি কাজের শুরুতে

প্রতিদিন আমরা কত কাজ করি—ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করি, নাস্তা খাই, অফিস বা মাঠে যাই, পড়াশোনায় বসি, ব্যবসার হিসাব মেলাই। এইসব কাজের বেশিরভাগই হয় যান্ত্রিকভাবে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, প্রতিটি কাজের শুরুতেই একটি ছোট্ট বাক্য বলতে—”বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম”। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই আমল সাধারণ একটি কাজকে ইবাদতে পরিণত করে, আর কাজে নেমে আসে আল্লাহর বরকত।

বিসমিল্লাহর অর্থ ও মর্ম

“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” অর্থ—”আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।” এই বাক্যে তিনটি গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে। প্রথমত, আমরা স্বীকার করি যে নিজের শক্তিতে আমরা কিছুই করতে পারি না; আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না। দ্বিতীয়ত, আমরা তাঁর নামে শুরু করি—অর্থাৎ এই কাজটি তাঁর সন্তুষ্টির জন্য, তাঁর বিধান মেনে করব। তৃতীয়ত, তাঁর দুটি মহান গুণ—রহমান ও রহিম—স্মরণ করে আমরা তাঁর দয়া ও করুণার আশা করি।

কুরআন মাজিদের প্রতিটি সূরার শুরুতে (সূরা আত-তাওবাহ ব্যতীত) এই বাক্যটি লেখা থাকে। সূরা আল-ফাতিহার প্রথম আয়াত হিসেবেও এটি তিলাওয়াত করা হয়। এছাড়া সূরা আন-নামলে সুলাইমান (আ.)-এর চিঠির শুরুতে এই বাক্যটি উদ্ধৃত হয়েছে: “ইন্নাহু মিন সুলাইমানা ওয়া ইন্নাহু বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” (সূরা আন-নামল: ৩০)—অর্থাৎ “নিশ্চয়ই এটি সুলাইমানের পক্ষ থেকে, এবং নিশ্চয়ই এটি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ দিয়ে শুরু।” দেখুন, একজন নবীও তাঁর চিঠি শুরু করেছিলেন এই বাক্য দিয়ে!

হাদিসে বিসমিল্লাহ বলার ফজিলত

১. খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যখন কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশের সময় ও খাবারের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে, তখন শয়তান তার সঙ্গীদের বলে—”তোমাদের জন্য এখানে রাত কাটানোর জায়গাও নেই, রাতের খাবারও নেই।” আর যখন সে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে না, তখন শয়তান বলে—”তোমরা রাত কাটানোর জায়গা পেয়ে গেছ।” আর যখন খাবারের সময়ও আল্লাহর নাম স্মরণ করে না, তখন বলে—”তোমরা রাত কাটানোর জায়গা ও রাতের খাবার—দুটোই পেয়ে গেছ” (সহিহ মুসলিম: ২০১৮)।

২. গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিসমিল্লাহ ছাড়া অসম্পূর্ণ

হাদিসে এসেছে: প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যা “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়ে শুরু করা হয় না, তা অসম্পূর্ণ ও বরকতহীন থেকে যায় (সুনান ইবনে মাজাহ: ১৮৯৪)। এই হাদিসটি আমাদের শেখায়—কাজ যত বড়ই হোক, আল্লাহর নাম ছাড়া শুরু করলে তাতে পূর্ণ বরকত আসে না।

৩. ভুলে গেলে মাঝখানে পড়ার দোয়া

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন আল্লাহর নাম নেয় (বিসমিল্লাহ বলে)। আর যদি শুরুতে ভুলে যায়, তাহলে সে যেন বলে: “বিসমিল্লাহি ফি আউওয়ালিহি ওয়া আখিরিহি”—এর শুরুতে ও শেষে আল্লাহর নামে (সুনান আবু দাউদ: ৩৭৬৭; জামে তিরমিজি: ১৮৫৮)। সুতরাং ভুলে গেলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই—মনে পড়ামাত্র পড়ে নিলেই হয়।

দৈনন্দিন জীবনে কোথায় কোথায় বিসমিল্লাহ বলবেন

বিসমিল্লাহ শুধু খাওয়ার আগের দোয়া নয়; এটি জীবনের প্রতিটি কাজের সঙ্গী হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবাদের জীবন থেকে আমরা জানি, তারা ছোট-বড় সব কাজেই আল্লাহর নাম নিতেন।

ঘর থেকে বের হওয়া ও প্রবেশে

ঘর থেকে বের হওয়ার সময় “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ”—আল্লাহর নামে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে বের হলাম—বলা সুন্নত (সুনান আবু দাউদ: ৫০৯৫)। আর ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর নাম নিলে শয়তান সেই ঘরে থাকতে পারে না (সহিহ মুসলিম: ২০১৮)।

ওজু, পোশাক ও ঘুমের সময়

ওজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত; হাদিসে এসেছে, যে ওজুতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, তা পূর্ণতা পায় না (জামে তিরমিজি: ২৫)। পোশাক পরার সময় এবং ঘুমাতে যাওয়ার সময় দরজা-জানালা বন্ধ করে আল্লাহর নাম নেওয়ার নির্দেশও হাদিসে এসেছে (সহিহ বুখারি: ৩২৮০)।

কাজ, পড়াশোনা ও যাত্রার শুরুতে

অফিসের কাজে বসার আগে, পরীক্ষার খাতা খোলার আগে, ব্যবসায়িক লেনদেনের আগে, গাড়ি বা যানবাহনে ওঠার সময় বিসমিল্লাহ বলুন। যানবাহনে ওঠার দোয়া—”বিসমিল্লাহি মাজরেহা ওয়া মুরসাহা” (এর চলা ও থামা আল্লাহর নামে; সূরা হূদ: ৪১)—নূহ (আ.)-এর নৌকার ঘটনা থেকে আমরা শিখেছি।

শুধু জিহ্বায় নয়, মনেও

বিসমিল্লাহ বলা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এর আসল প্রাণ হলো মনের ভরসা। যখন আমরা “আল্লাহর নামে শুরু করছি” বলি, তখন মনে মনে এই বিশ্বাস রাখতে হবে—এই কাজের সফলতা আমার হাতে নয়, আল্লাহর হাতে। তিনি চাইলে সহজ করে দেবেন। এই ভরসাই দুশ্চিন্তা কমায়, মনকে শান্ত করে এবং কাজে মনোযোগ বাড়ায়। অনেক সময় আমরা বিসমিল্লাহ বলি অভ্যাসবশত, অর্থ না বুঝে। চেষ্টা করুন—প্রতিবার বলার সময় এক মুহূর্ত থেমে অর্থটা মনে করতে।

উপসংহার

বিসমিল্লাহ একটি ছোট্ট বাক্য, কিন্তু এর শক্তি অনেক বড়। এটি আমাদের প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সাথে যুক্ত করে, শয়তানের অংশগ্রহণ রুখে দেয়, কাজে বরকত নিয়ে আসে এবং মনে শান্তি দেয়। আজ থেকেই প্রতিশ্রুতি নিন—খাওয়ার আগে, ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, কাজে বসার আগে, ঘুমাতে যাওয়ার সময়—প্রতিটি কাজের শুরুতে একবার “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলবেন। দেখবেন, আপনার দৈনন্দিন জীবনটাই বদলে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top