অসুস্থতা মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কখনো হালকা জ্বর-সর্দি, কখনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ—সব অবস্থাতেই মুমিনের প্রথম আশ্রয় আল্লাহ তাআলার কাছে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, রোগ যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, তেমনি ধৈর্য ধরলে তা গুনাহ মাফের মাধ্যমও হয়ে যায়। আর শিফা বা আরোগ্যের জন্য কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ আমাদের সুন্দর ও সহজ কিছু দোয়া এবং রুকইয়ার নিয়ম শিখিয়ে দিয়েছে।
কুরআন: শিফার প্রধান উৎস
আল্লাহ তাআলা কুরআনকে মুমিনদের জন্য শিফা বা আরোগ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: “আর আমি কুরআনে এমন কিছু নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।” (সূরা ইসরা, আয়াত: ৮২) আরেক আয়াতে এসেছে: “আর তিনি মুমিনদের অন্তরসমূহকে রোগমুক্ত করবেন।” (সূরা তাওবা, আয়াত: ১৪) তাই অসুস্থ হলে কুরআনের আয়াত পড়ে আল্লাহর কাছে শিফা চাওয়া—এটাই রুকইয়ার ভিত্তি। মনে রাখতে হবে, শিফা দানকারী একমাত্র আল্লাহ; আয়াত ও দোয়া কেবল তাঁর রহমত লাভের মাধ্যম।
রোগীর জন্য প্রসিদ্ধ দোয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ ব্যক্তির জন্য যে দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পড়তেন, তা হলো:
আরবি: اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَأْسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বান্নাস, আযহিবিল বা’সা, ইশফি আনতাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি মানুষের প্রতিপালক। আপনি কষ্ট দূর করে দিন। আপনি শিফা দান করুন, কারণ আপনিই শিফা দানকারী। আপনার শিফা ছাড়া কোনো শিফা নেই। এমন পূর্ণ শিফা দান করুন, যার পরে আর কোনো রোগ অবশিষ্ট না থাকে।” (সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ৫৭৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২১৯১)
আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর ডান হাত দিয়ে রোগীর শরীরে মাসেহ করতেন এবং এই দোয়াটি পড়তেন। রোগীকে দেখতে গেলে আরেকটি ছোট দোয়া পড়া সুন্নত: “লা বা’সা ত্বাহূরুন ইন শাআল্লাহ”—অর্থাৎ “ভয় নেই, আল্লাহ চাইলে এটি পবিত্রতার মাধ্যম হবে।” (সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ৩৬১৬)
ব্যথার স্থানে পড়ার বিশেষ দোয়া
শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা থাকলে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি বিশেষ আমল শিখিয়েছেন: ব্যথার স্থানে ডান হাত রেখে প্রথমে তিনবার “বিসমিল্লাহ” বলবে, তারপর সাতবার এই দোয়াটি পড়বে:
আরবি: أَعُوذُ بِاللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ
উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযির।
অর্থ: “আমি আল্লাহ ও তাঁর ক্ষমতার আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আমি যে কষ্ট অনুভব করছি এবং যার আশঙ্কা করছি, তার অনিষ্ট থেকে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২০২) নিজের জন্য এই আমলটি নিজেই করা যায়; অন্যের জন্য করলে তার ব্যথার স্থানে হাত রেখে পড়া যায়।
সূরা ফাতিহা ও তিন কুল দিয়ে রুকইয়া
রুকইয়ার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সূরা হলো সূরা ফাতিহা। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, একজন সাহাবি সূরা ফাতিহা পড়ে একজন রোগীকে সুস্থ করেছিলেন এবং নবীজি ﷺ তা অনুমোদন করেছেন। (সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ৫৭৩৬) সূরা ফাতিহা সাতবার পড়ে রোগীর শরীরে ফুঁ দেওয়া যায়।
একইভাবে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস—এই তিনটি সূরা অসুস্থতা থেকে সুরক্ষার জন্য পড়া হয়। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ হলে এই তিনটি সূরা পড়তেন এবং হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মাসেহ করতেন। (সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ৫০১৭) তিনটি সূরা তিনবার করে পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দেওয়া একটি প্রমাণিত আমল।
রুকইয়ার সঠিক নিয়ম: ধাপে ধাপে
১. প্রথমে ওজু করে নিন এবং মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে শিফা একমাত্র আল্লাহ দেন।
২. সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, তিন কুল এবং উপরের দোয়াগুলো পড়ুন।
৩. পড়ার পর হাতে হালকা ফুঁ দিয়ে নিজের বা রোগীর শরীরে মাসেহ করুন।
৪. চাইলে পানিতে পড়ে ফুঁ দিয়ে সেই পানি পান করা বা তা দিয়ে গোসল করা যায়।
৫. সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন জিকির ও দোয়া নিয়মিত পড়ুন—এটি রুকইয়ার সুরক্ষামূলক অংশ।
৬. নিয়মিততা বজায় রাখুন; একদিন পড়েই হতাশ হবেন না। রুকইয়া একটি ধারাবাহিক আমল।
যা থেকে অবশ্যই বাঁচবেন
রুকইয়ার নামে কোনো শিরকি কথা, অজানা মন্ত্র, তাবিজ বা হারাম পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি নিজে শিফা দিতে পারে—এমন বিশ্বাস রাখাও ঠিক নয়। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা: রুকইয়া চিকিৎসার বিকল্প নয়। গুরুতর অসুস্থতায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন; চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি রুকইয়া করাই সুন্নতের পথ। বদনজর বা যাদুর সন্দেহে কাউকে দোষারোপ করাও ইসলাম সমর্থন করে না।
উপসংহার
রোগ মুমিনের জন্য কখনো শাস্তি নয়, বরং ধৈর্য ও দোয়ার মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ। কুরআনের আয়াত, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দোয়া এবং সঠিক নিয়মের রুকইয়া আমাদের হাতে একটি নিরাপদ ও বরকতময় পথ তুলে দিয়েছে। অসুস্থ হলে প্রথমে আল্লাহর কাছে শিফা চান, প্রমাণিত দোয়াগুলো নিয়মিত পড়ুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নিন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুস্থতা দান করুন এবং অসুস্থ ভাই-বোনদের দ্রুত শিফা নসিব করুন। আমিন।



