সফরের দোয়া ও আদব

সফর মানুষের জীবনের একটি পরিচিত অংশ। কেউ কাজের জন্য, কেউ পড়াশোনার জন্য, কেউ আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার জন্য, আবার কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সফরে বের হন। সফর যেমন নতুন অভিজ্ঞতা দেয়, তেমনি এতে ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা ও বিপদের আশঙ্কাও থাকে। তাই ইসলাম সফরকে শুধু যাতায়াতের কাজ হিসেবে দেখেনি; সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর স্মরণ, দোয়া ও আদবের একটি সুন্দর ব্যবস্থা দিয়েছে। সফরের দোয়া পড়া মানে শুধু কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করা নয় — এর অর্থ হলো, নিজের নিরাপত্তা ও সফলতা আল্লাহর হাতে সঁপে দেওয়া।

বাহনে ওঠার দোয়া

বাহনে ওঠার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ যে দোয়া পড়তেন, তার মূল ভাব কুরআন থেকে নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন — যিনি এই বাহনকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন, অথচ আমরা নিজেদের শক্তিতে একে আয়ত্ত করতে পারতাম না; আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবের কাছেই ফিরে যাব (সূরা আয-যুখরুফ, ৪৩:১৩-১৪)। এই আয়াতের আলোকে বাহনে ওঠার দোয়াটি হলো: “সুবহানাল্লাযী সাখখারা লানা হাযা ওয়া মা কুন্না লাহু মুকরিনীন, ওয়া ইন্না ইলা রব্বিনা লামুনকলিবূন।” অর্থাৎ — পবিত্র সেই সত্তা, যিনি এই বাহনকে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন; আমরা নিজেরা একে বশ করতে পারতাম না, আর নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রবের দিকে ফিরে যাব। এরপর তিনবার আলহামদুলিল্লাহ, তিনবার আল্লাহু আকবার বলা এবং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়ার কথা হাদিসে এসেছে (সুনান আবু দাউদ, সুনান আত-তিরমিজি)।

এই দোয়ার মধ্যে দুটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। প্রথমত, বাহন যত আধুনিকই হোক, তার নিয়ন্ত্রণ আসলে আল্লাহর হাতে — তাই অহংকার নয়, শুকরিয়া প্রকাশ করাই মুমিনের কাজ। দ্বিতীয়ত, সফরের কথা মনে করিয়ে দেয় আখিরাতের সফরের কথা — যেমন আমরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাই, তেমনি একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতেই হবে।

সফর শুরুর দোয়া

বাহনে ওঠার পর সফরের জন্য একটি বিশেষ দোয়া পড়া সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ সফরে বের হওয়ার সময় পড়তেন: “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা ফী সাফারিনা হাযাল বিররা ওয়াত তাকওয়া, ওয়া মিনাল আমালি মা তারদা। আল্লাহুম্মা হাওউইন আলাইনা সাফারানা হাযা ওয়াতউই আন্না বু‘দাহ। আল্লাহুম্মা আনতাস সাহিবু ফিস সাফারি ওয়াল খালীফাতু ফিল আহল।” অর্থাৎ — হে আল্লাহ! এই সফরে আমরা তোমার কাছে নেকি ও তাকওয়া চাই এবং এমন আমল চাই যা তুমি পছন্দ করো। হে আল্লাহ! আমাদের এই সফর সহজ করে দাও এবং এর দূরত্ব কমিয়ে দাও। হে আল্লাহ! তুমিই সফরে আমাদের সঙ্গী এবং পরিবারের দেখাশোনাকারী (সহীহ মুসলিম)।

এই দোয়াটি সফরের পুরো দর্শনটাই বদলে দেয়। সফর শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয়; সফরে নেক আমল করা, তাকওয়া ধরে রাখা এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করাও এর অংশ। যিনি এই দোয়া পড়ে বের হন, তিনি একা বের হন না — তাঁর সঙ্গী স্বয়ং আল্লাহর রহমত।

সফরের আদব: যা মনে রাখা জরুরি

সফরের প্রথম আদব হলো সঠিক নিয়ত। সফর যদি হালাল উদ্দেশ্যে হয় — যেমন জীবিকা, শিক্ষা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা বা দ্বীনি কাজ — তবে সফরের প্রতিটি কষ্টও সওয়াবের কারণ হতে পারে। আর সফরে গিয়ে হারাম কাজে জড়িয়ে পড়া থেকে বেঁচে থাকাই আসল পরীক্ষা।

দ্বিতীয় আদব হলো সঙ্গী ও পরামর্শ। একা সফরের চেয়ে সঙ্গী নিয়ে সফর করা উত্তম, বিশেষ করে দীর্ঘ সফরে। হাদিসে দল বেঁধে সফরে একজনকে আমির বা নেতা বানানোর নির্দেশ এসেছে (সুনান আবু দাউদ) — যাতে সিদ্ধান্তে শৃঙ্খলা থাকে এবং কেউ বিপদে পড়লে সবাই এগিয়ে আসে।

তৃতীয় আদব হলো নামাজের যত্ন। সফরে ফরজ নামাজ ছাড়া যায় না; বরং শরিয়ত সফরে নামাজ সহজ করে দিয়েছে — চার রাকাতের ফরজ দুই রাকাত (কসর) পড়ার সুযোগ এবং প্রয়োজনে দুই ওয়াক্ত একসাথে (জমা) পড়ার সুযোগ। তাই সফরে নামাজ বাদ দেওয়ার অজুহাত নেই; বরং গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নামাজের সময় ও জায়গা ঠিক করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

চতুর্থ আদব হলো পরিবার ও প্রতিবেশীর খোঁজ রাখা। সফরে বের হওয়ার আগে পরিবারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া, ঋণ বা আমানতের কথা জানিয়ে যাওয়া এবং ফিরে এসে সবার খোঁজ নেওয়া সুন্নতের অংশ। আর সফরে যাঁদের সাথে দেখা হয় — চালক, সহযাত্রী, মেজবান — সবার সাথে ভালো ব্যবহার করা মুমিনের পরিচয়।

পঞ্চম আদব হলো নিরাপত্তা ও সতর্কতা। সফরের দোয়া পড়া যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সতর্কভাবে চলা — গাড়ির চালককে তাড়াহুড়ো করতে বাধ্য না করা, রাতে অপরিচিত পথে একা না যাওয়া, মূল্যবান জিনিসের যত্ন নেওয়া এবং অসুস্থতা বা বিপদের সময় ধৈর্য ধরা। তাওয়াক্কুল মানে সতর্কতা ছেড়ে দেওয়া নয়; সতর্কতা নেওয়ার পর আল্লাহর উপর ভরসা করাই তাওয়াক্কুল।

ফিরে আসার দোয়া ও মুসাফিরের দোয়ার মর্যাদা

সফর থেকে ফিরে আসার সময়ও একটি সুন্দর দোয়া আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিরে আসার সময় পড়তেন: “আয়িবূনা, তায়িবূনা, আবিদূনা, লি রব্বিনা হামিদূন।” অর্থাৎ — আমরা ফিরে আসছি, তওবাকারী হয়ে, ইবাদতকারী হয়ে, আমাদের রবের প্রশংসাকারী হয়ে (সহীহ মুসলিম)। সফর শেষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরতে পারার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া — এটাই মুমিনের সফরের শেষ অধ্যায়।

আর একটি বিশেষ সুসংবাদ: মুসাফিরের দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা রাখে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া সন্দেহাতীতভাবে কবুল হয় — মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া (সুনান আত-তিরমিজি)। তাই সফরে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং উম্মতের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত — সফরের কষ্টটুকু তখন দোয়া কবুলের সুযোগে পরিণত হয়।

উপসংহার

সফরের দোয়া ও আদব আমাদের শেখায় — যাত্রা শুরু হোক আল্লাহর নামে, চলার পথে থাকুক তাঁর স্মরণ, আর ফিরে আসা হোক তাঁর শুকরিয়া দিয়ে। বাহনে ওঠার দোয়া, সফরের দোয়া, নামাজের যত্ন, সঙ্গীদের সাথে ভালো ব্যবহার এবং নিরাপত্তার সতর্কতা — এই সব মিলেই একটি সফর হয় নিরাপদ, বরকতময় ও সওয়াবের। আল্লাহ যেন আমাদের প্রতিটি সফর সহজ করে দেন, বিপদ থেকে হেফাজত করেন এবং নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনেন। আমিন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top