ভূমিকা
জিকির মানে আল্লাহকে স্মরণ করা। মুখে তাঁর নাম উচ্চারণ করা, অন্তরে তাঁর মহত্ত্ব অনুভব করা এবং কাজে তাঁর সন্তুষ্টি খোঁজা — সবই জিকিরের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে’ (সূরা রা‘দ: ২৮)। দুনিয়ার কোলাহল, দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তির মাঝে যে অন্তর আল্লাহর স্মরণে জেগে থাকে, সেই অন্তরই সত্যিকারের শান্তি পায়। আর জিকিরের সবচেয়ে সহজ ও পরিচিত রূপ হলো তিনটি ছোট বাক্য — সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার।
এই লেখায় আমরা জানব জিকিরের প্রকারভেদ কী, এই তিনটি বাক্যের অর্থ ও ফজিলত কী, এবং দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে এগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করা যায়।
জিকিরের প্রকারভেদ: জবান, অন্তর ও আমল
আলেমগণ জিকিরকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি হলো জবানের জিকির — মুখে আল্লাহর নাম ও প্রশংসা উচ্চারণ করা, যেমন সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা, দরুদ পড়া। দ্বিতীয়টি অন্তরের জিকির — মনে মনে আল্লাহর মহত্ত্ব, তাঁর নিয়ামত ও আখিরাতের কথা চিন্তা করা, তাঁকে ভয় করা ও তাঁর প্রতি আশা রাখা। তৃতীয়টি আমলের জিকির — অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি কাজে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা; নামাজ পড়া, হালাল উপার্জন করা, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা — এসবও আল্লাহর স্মরণেরই প্রকাশ।
এই তিন প্রকার একে অপরের পরিপূরক। শুধু মুখে জিকির আর অন্তরে গাফলত থাকলে তার পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যায় না। আবার অন্তরে স্মরণ থাকলে মুখ আপনা থেকেই জিকিরের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই সেরা জিকির হলো সেটি, যেখানে জবান ও অন্তর একসঙ্গে উপস্থিত থাকে।
সুবহানাল্লাহ: আল্লাহ সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র
সুবহানাল্লাহ অর্থ — আল্লাহ সকল দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। আমরা যখন সুবহানাল্লাহ বলি, তখন স্বীকার করি যে আল্লাহ কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন, তাঁর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই, তিনি সব ধরনের অপূর্ণতা থেকে মুক্ত। এই বাক্যটি আল্লাহর প্রতি আমাদের ধারণাকে পরিশুদ্ধ করে। অনেক সময় আমরা না বুঝে আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করি; সুবহানাল্লাহ সেই ভুল ধারণা ভেঙে দেয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা, মীযানে ভারী এবং পরম করুণাময়ের কাছে অত্যন্ত প্রিয়: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম’ (সহিহ বুখারি: ৬৪০৬)। দেখুন, মাত্র দুটি ছোট বাক্য — অথচ কিয়ামতের দিনের পাল্লায় এগুলোর ওজন কত ভারী! প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় একশো বার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ পড়ার অভ্যাস অন্তরে প্রশান্তি আনে।
আলহামদুলিল্লাহ: সকল প্রশংসা আল্লাহর
আলহামদুলিল্লাহ অর্থ — সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। এই বাক্যটি শুকরিয়ার সারকথা। আমরা যে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, যে খাবার খাচ্ছি, যে সুস্থতা ভোগ করছি — সবই আল্লাহর দান। আলহামদুলিল্লাহ বলার মাধ্যমে আমরা স্বীকার করি, এই নিয়ামতগুলো আমাদের নিজের অর্জন নয়, আল্লাহর অনুগ্রহ। কুরআনের প্রথম সূরার প্রথম আয়াতই শুরু হয়েছে এই বাক্য দিয়ে: ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সকল জগতের প্রতিপালক’ (সূরা ফাতিহা: ২)।
শুকরিয়ার একটি বড় উপকার হলো, এটি নিয়ামতকে বাড়িয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও দেবো’ (সূরা ইবরাহীম: ৭)। তাই ভালো কিছু ঘটলে আলহামদুলিল্লাহ বলুন, আর কষ্টের সময়েও বলুন — কারণ কষ্টের মাঝেও এমন অনেক নিয়ামত থাকে, যা আমরা খেয়াল করি না। যে ব্যক্তি প্রতিটি অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলতে শেখে, তার জীবনে অভিযোগ কমে যায়, আর সন্তুষ্টি বেড়ে যায়।
আল্লাহু আকবার: আল্লাহই সবচেয়ে বড়
আল্লাহু আকবার অর্থ — আল্লাহ সবচেয়ে বড়। এই বাক্যটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। আমাদের সমস্যা যত বড়ই মনে হোক, আল্লাহ তার চেয়ে বড়। আমাদের দুশ্চিন্তা যত ভারীই হোক, আল্লাহ তার চেয়ে মহান। এই বিশ্বাসই মুমিনের সাহসের উৎস। আজানের শুরুতে, নামাজের প্রতিটি ধাপে, ঈদের তাকবিরে — বারবার আল্লাহু আকবার বলার মাধ্যমে আমাদের মনে এই সত্যটি গেঁথে দেওয়া হয়: দুনিয়ার কোনো শক্তি, কোনো সমস্যা, কোনো মানুষ আল্লাহর চেয়ে বড় নয়।
ভয়ের মুহূর্তে, বিপদের সময়ে, এমনকি আনন্দের মুহূর্তেও আল্লাহু আকবার বলুন। এতে অন্তর থেকে অহংকার দূর হয়, কারণ যে ব্যক্তি সত্যিকারভাবে বিশ্বাস করে আল্লাহই সবচেয়ে বড়, সে নিজেকে বড় ভাবতে পারে না। আর যে নিজেকে ছোট ভাবে, আল্লাহ তাকে বড় করে দেন।
তিন জিকিরের সমন্বয়: নামাজের পরের তাসবিহ
এই তিনটি বাক্যের সবচেয়ে সুন্দর সমন্বয় দেখা যায় প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরের তাসবিহে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন: নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়তে, তারপর একবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর’ পড়ে শত পূর্ণ করতে (সহিহ মুসলিম: ৫৯৭)। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি এভাবে পড়ে, তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়, যদিও তা সমুদ্রের ফেনারাশির মতো হয়।
এই আমলটি মাত্র কয়েক মিনিটের, কিন্তু প্রতিদান অসাধারণ। নামাজ শেষে তাড়াহুড়ো করে উঠে যাওয়ার বদলে এই কয়েক মিনিট বসে তাসবিহ পড়ার অভ্যাস গড়ুন; গোনার জন্য তাসবিহ দানা বা আঙুলের গিঁট ব্যবহার করতে পারেন। একদিন অনেক পড়ে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে প্রতিদিন অল্প করে পড়া উত্তম।
দৈনন্দিন জীবনে জিকিরের রুটিন
জিকিরকে জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়া। সকালে ঘুম থেকে উঠে কয়েকবার সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলুন। রাস্তায় হাঁটার সময়, রান্নার সময়, গাড়িতে বসে, কাজের বিরতিতে — এই সময়গুলোতে জবানকে জিকিরে ব্যস্ত রাখুন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে বেশি বেশি স্মরণ করো’ (সূরা আহযাব: ৪১)। ‘বেশি বেশি’ শব্দটি লক্ষ্য করুন — জিকির এমন আমল, যার কোনো সীমা নির্ধারণ করা হয়নি; যত বেশি, তত ভালো।
বাচ্চাদেরও ছোটবেলা থেকে এই তিনটি বাক্য শেখান — খেলার ছলে, ঘুমানোর আগে, খাবারের পর। আর মনে রাখবেন, জিকিরের জন্য ওজু শর্ত নয়; যেকোনো অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করা যায়। তবে মনোযোগ দিয়ে অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন।
উপসংহার
সুবহানাল্লাহ আমাদের শেখায় আল্লাহ পবিত্র, আলহামদুলিল্লাহ শেখায় তিনি সকল প্রশংসার যোগ্য, আর আল্লাহু আকবার শেখায় তিনি সবচেয়ে বড়। এই তিনটি বাক্য মিলেই একজন মুমিনের জীবনদর্শন তৈরি হয়: পবিত্রতা, কৃতজ্ঞতা ও মহত্ত্বের স্বীকৃতি। আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিন — প্রত্যেক নামাজের পরের তাসবিহ আর ছাড়বেন না, আর দিনের ফাঁকে ফাঁকে এই তিনটি বাক্য মুখে রাখবেন। জবান যখন আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকে, অন্তর তখন গাফলত থেকে মুক্ত থাকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বেশি বেশি জিকির করার তাওফীক দান করুন। আমীন।



