ভূমিকা
দরুদ শরীফ এমন এক আমল, যা মুখে উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরকে নরম করে দেয় এবং বান্দাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক গভীর সম্পর্কের বন্ধনে জড়িয়ে দেয়। দরুদ মানে রাসূলের জন্য আল্লাহর কাছে রহমত, বরকত ও শান্তি কামনা করা। আল্লাহ তাআলা নিজে তাঁর প্রিয় নবীর প্রতি দরুদ পাঠান, ফেরেশতারাও পাঠান, আর মুমিনদেরকে এই আমলের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তাই দরুদ শুধু একটি সুন্দর বাক্য নয়; এটি ঈমানের পরিচয়, ভালোবাসার প্রকাশ এবং রহমত লাভের অন্যতম বড় দরজা।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠাও’ (সূরা আহযাব: ৫৬)। লক্ষ্য করুন, এই আয়াতে প্রথমে আল্লাহর নিজের আমলের কথা বলা হয়েছে, তারপর ফেরেশতাদের, তারপর মুমিনদের আদেশ দেওয়া হয়েছে। যে আমলে আল্লাহ নিজে অংশ নেন, তার মর্যাদা কত বড় হতে পারে, তা ভেবে দেখুন। দরুদ পাঠ করা মানে আল্লাহর সেই মহান আমলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা।
দরুদের ফজিলত: একবার পড়লে দশগুণ রহমত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত নাযিল করেন’ (সুনানে নাসায়ী: ১২৯৭)। একবারের বিনিময়ে দশগুণ — এমন লাভজনক ব্যবসা আর কোথায় আছে? এছাড়া দরুদ পাঠকারীর দশটি গুনাহ মাফ করা হয় এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় বলে হাদিসে এসেছে। অর্থাৎ একটি ছোট আমল একসঙ্গে তিনটি উপকার দেয়: রহমত, গুনাহ মাফ এবং মর্যাদা বৃদ্ধি।
দরুদ মনের অস্থিরতা দূর করতেও বিশেষভাবে কার্যকর। যারা নিয়মিত দরুদ পড়েন, তারা অনুভব করেন — দুশ্চিন্তার মুহূর্তে দরুদ পড়লে অন্তর শান্ত হয়। কারণ দরুদ পড়ার সময় মন রাসূলের দিকে যায়, দুনিয়ার ভাবনা থেকে সরে আসে, আর আল্লাহর রহমতের আশায় অন্তর ভরে ওঠে। অনেক আলেম বলেন, দোয়া কবুলের অন্যতম উপায় হলো দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পড়া। দরুদ ছাড়া দোয়া যেন খামের ঠিকানা ছাড়া চিঠি — পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমে যায়।
জুমার দিনে দরুদ: বিশেষ নির্দেশনা
জুমার দিন সপ্তাহের সেরা দিন। এই দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি দরুদ পাঠের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা জুমার দিনে আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো, কারণ সেদিনের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়’ (সুনানে আবু দাউদ)। অর্থাৎ জুমার দিনের দরুদ সরাসরি রাসূলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা হাদিসে এসেছে — এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে?
জুমার দিনের আমল শুধু দরুদেই সীমাবদ্ধ নয়। এই দিনে সূরা কাহফ পড়া, গোসল করা, পরিষ্কার কাপড় পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, আগে আগে মসজিদে যাওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা — সবই সুন্নত আমল। তবে এর মধ্যে দরুদ এমন একটি আমল, যা ঘরে, পথে, কাজের ফাঁকে — যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় করা যায়। জুমার দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যতবার সম্ভব দরুদ পড়ার চেষ্টা করুন; সংখ্যা গোনার চেয়ে নিয়মিততা ও ভালোবাসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোন দরুদ পড়বেন: ছোট দরুদ ও দরুদে ইব্রাহিম
সবচেয়ে ছোট ও সহজ দরুদ হলো: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ’ — অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।’ ব্যস্ত সময়ে, হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে এই ছোট দরুদ বারবার পড়া যায়। আর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দরুদ হলো দরুদে ইব্রাহিম, যা আমরা নামাজের শেষ বৈঠকে পড়ি: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ…’। এই দরুদে ইব্রাহিম (আ.)-এর পরিবারের সঙ্গেও রাসূলের পরিবারের তুলনা করে রহমত কামনা করা হয়।
দরুদ পড়ার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা ভালো। প্রথমত, মনোযোগ দিয়ে পড়ুন — মুখে দরুদ, মনে অন্য চিন্তা, এতে আমলের স্বাদ কমে যায়। দ্বিতীয়ত, শুদ্ধ উচ্চারণের চেষ্টা করুন; ভুল হলে শিখে নিন, কিন্তু শেখার ভয়ে পড়া বন্ধ করবেন না — আল্লাহ চেষ্টা দেখেন। তৃতীয়ত, দরুদকে শুধু জুমার দিনের আমল বানিয়ে রাখবেন না; প্রতিদিনের রুটিনে কিছুটা সময় দরুদের জন্য রাখুন। সকালে ঘুম থেকে উঠে, নামাজের পর, ঘুমাতে যাওয়ার আগে — এই তিন সময়ে অল্প অল্প করে দরুদ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
দরুদ ও রাসূলের প্রতি ভালোবাসা
দরুদ আসলে ভালোবাসার মাপকাঠি। যাকে আমরা ভালোবাসি, তার কথা বারবার মনে পড়ে, তার নাম বারবার মুখে আসে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার দাবি করলে তার প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নত অনুসরণ করা এবং তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করা। দরুদ পড়তে পড়তে অন্তরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা বাড়ে, আর ভালোবাসা বাড়লে সুন্নত মানতে সহজ হয়। এই দুটি একে অপরকে শক্তিশালী করে।
এছাড়া দরুদ কিয়ামতের দিন সুপারিশ পাওয়ার একটি উপায়। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করে, কিয়ামতের দিন সে রাসূলের সবচেয়ে কাছে থাকবে। দুনিয়ায় যার সঙ্গে ভালোবাসা, আখিরাতে তার সঙ্গই তো সবচেয়ে বড় পাওয়া। তাই দরুদকে শুধু সওয়াবের হিসাব ভেবে নয়, ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে পড়ুন।
উপসংহার
আজ থেকেই একটি ছোট সিদ্ধান্ত নিন: প্রতিদিন অন্তত একশো বার দরুদ পড়বেন, আর জুমার দিনে এর চেয়ে বেশি। সংখ্যা মুখ্য নয়, নিয়মিততা মুখ্য। সকালে ফজরের পর দশ বার, কাজের ফাঁকে কিছু বার, রাতে ঘুমানোর আগে কিছু বার — এভাবেই অভ্যাস গড়ে ওঠে। আর জুমার দিন এলে পরিবারের সবাইকে মনে করিয়ে দিন — আজ দরুদের দিন, আজ বেশি বেশি দরুদ পড়ার দিন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসূলের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা ও নিয়মিত দরুদ পাঠের তাওফীক দান করুন। আমীন।




