সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে বাবা-মায়ের কাছে সবচেয়ে বড় আমানত। এই আমানতকে নেক, সৎ ও দ্বীনদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাবা-মায়ের চেষ্টা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি তাদের আন্তরিক দোয়া। কারণ সন্তানের ভাগ্য ও হেদায়েতের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর হাতে, আর বাবা-মায়ের দোয়া সেই দরজা খোলার অন্যতম মাধ্যম।
বাবা-মায়ের দোয়া কেন এত মূল্যবান?
ইসলামে বাবা-মায়ের দোয়াকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না — তার মধ্যে একজন হলেন সন্তানের জন্য পিতার দোয়া (সুনান আত-তিরমিজি)। অর্থাৎ সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি কল্যাণের কথা আল্লাহর দরবারে কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা রাখে।
এ কারণেই বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের জন্য সবসময় ভালো কথা বলা, ভালো দোয়া করা। রাগের মুহূর্তেও সন্তানের বিরুদ্ধে বদদোয়া করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ হাদিসে এসেছে — নিজের সন্তান, সম্পদ ও নিজের বিরুদ্ধে বদদোয়া কোরো না, পাছে তা কবুলের সময়ের সাথে মিলে যায় (সুনান আবু দাউদ)।
কুরআনে সন্তানের জন্য দোয়া
কুরআন আমাদের শিখিয়েছে সন্তানের জন্য কীভাবে দোয়া করতে হয়। নেক সন্তান চাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর দোয়াটি এসেছে সূরা আল-ফুরকানে:
“রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিন ওয়া জা‘আলনা লিল মুত্তাকীনা ইমামা।” অর্থাৎ — হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দাও (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৭৪)।
ইবরাহীম (আ.) তাঁর সন্তানদের জন্য দোয়া করেছিলেন: “রব্বিজ‘আলনী মুকীমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিয়্যাতী, রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দু‘আ।” — হে আমার রব! আমাকে নামাজ কায়েমকারী বানাও এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও (বানাও); হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করো (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৪০)।
আর যাকারিয়া (আ.) বৃদ্ধ বয়সে নেক সন্তান চেয়ে দোয়া করেছিলেন: “রব্বি হাব লী মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান তায়্যিবাহ, ইন্নাকা সামী‘উদ দু‘আ।” — হে আমার রব! তোমার পক্ষ থেকে আমাকে পবিত্র সন্তান দান করো; নিশ্চয়ই তুমি দোয়া শ্রবণকারী (সূরা আলে ইমরান, ৩:৩৮)।
সন্তানের জন্য কী কী চাইবেন?
সন্তানের জন্য দোয়া করার সময় শুধু দুনিয়ার সফলতা নয়, আখিরাতের সফলতাও চাইতে হবে। বাবা-মা দোয়া করতে পারেন — সন্তান যেন ঈমানদার হয়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি হয়, কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে, সৎ চরিত্রের অধিকারী হয়, হারাম থেকে বেঁচে থাকে, ভালো বন্ধু ও ভালো পরিবেশ পায় এবং বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণকারী হয়। সুস্থতা, রিজিকের বরকত ও পড়াশোনায় মনোযোগের জন্যও দোয়া করা যায়।
দোয়ার সাথে চেষ্টাও জরুরি
দোয়া কখনো চেষ্টার বিকল্প নয়। সন্তানকে নেক বানাতে চাইলে বাবা-মাকে নিজেদের জীবনে তার নমুনা দেখাতে হবে। সন্তান যা দেখে, তাই শেখে — বাবা-মা নামাজ পড়লে সন্তান নামাজ শেখে, বাবা-মা সত্য বললে সন্তান সত্য শেখে। ভালো পরিবেশ দেওয়া, সন্তানের সাথে সময় কাটানো, তার কথা ধৈর্য ধরে শোনা এবং ভুল করলে ভালোবাসা দিয়ে শুধরে দেওয়া — এগুলোই দোয়ার বাস্তব রূপ।
দোয়া করার উত্তম সময়গুলোতেও সন্তানকে স্মরণ রাখুন — ফজরের পর, তাহাজ্জুদে, সিজদায়, আজান ও ইকামতের মাঝে এবং জুমার দিনে। আর সবচেয়ে সহজ আমল: প্রতিদিন সন্তানের মাথায় হাত রেখে বা তার অনুপস্থিতিতে তার নাম নিয়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া।
সন্তানের জন্য প্রতিদিনের একটি ছোট রুটিন
দোয়াকে জীবনের অংশ বানাতে বড় আয়োজন লাগে না। প্রতিদিন ফজরের পর দুই মিনিট সময় নিয়ে সন্তানের নাম ধরে আল্লাহর কাছে তার ঈমান, সুস্থতা ও চরিত্রের জন্য দোয়া করুন। সন্তান ঘুম থেকে উঠলে তার কপালে চুমু দিয়ে বা মাথায় হাত রেখে কল্যাণের কথা বলুন — এই ছোট কাজটি সন্তানের মনে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার বোধ গড়ে তোলে। রাতে ঘুমানোর আগে সন্তানের সাথে একসাথে একটি ছোট দোয়া পড়ুন, যেমন ঘুমের দোয়া বা আয়াতুল কুরসি; এতে সন্তান ছোটবেলা থেকেই দোয়ার অভ্যাস শিখবে। সন্তান কোনো পরীক্ষা, অসুস্থতা বা কঠিন সময়ের মুখে পড়লে তাকে শুধু উপদেশ না দিয়ে তার সামনেই তার জন্য দোয়া করুন — সন্তান যখন দেখবে বাবা-মা তার জন্য আল্লাহর কাছে হাত তুলছেন, তখন তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভরসা জন্মাবে। আর সন্তানের ভালো কাজ দেখলে সাথে সাথে শুকরিয়া আদায় করুন ও তার জন্য বরকতের দোয়া করুন; এতে ভালো কাজের প্রতি তার আগ্রহ আরও বাড়বে।
উপসংহার
সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়া একটি চলমান আমল — এটি একদিনের কাজ নয়, সারাজীবনের সঙ্গী। সন্তান ছোট থাকুক বা বড় হয়ে যাক, বাবা-মায়ের দোয়া তার জীবনের প্রতিটি মোড়ে আলোর মতো কাজ করে। তাই আজ থেকেই সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করার অভ্যাস গড়ুন — আল্লাহ যেন আমাদের সন্তানদের চোখের শীতলতা ও আখিরাতের পাথেয় বানিয়ে দেন। আমিন।



